Site Overlay

দীপক আগারওয়াল সাক্ষাৎকার: যেভাবে খুঁজে বের করি সাকিব নিষিদ্ধের নেপথ্যের এই জুয়াড়িকে

সম্প্রতি নেত্র নিউজ-এ ‘এক ক্রিকেট জুয়াড়ির স্বীকারোক্তি’ শিরোনামে একটি দীর্ঘপাঠ লিখেছি আমি। বাংলাদেশের ক্রিকেট তারকা সাকিব আল হাসানের নিষিদ্ধ হওয়ার নেপথ্যে যেই সন্দেহভাজন ক্রিকেট জুয়াড়িকে দায়ী করেছিল আইসিসি, সেই দীপক আগারওয়ালের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতেই লেখাটি আমি লিখেছি। এই নিবন্ধ প্রকাশের পর নানা ধরণের প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। কীভাবে আমি দীপক আগারওয়ালকে খুঁজে পেলাম, কীভাবে নিশ্চিত হলাম যে তিনিই আসল দীপক আগারওয়াল, ইত্যাদি নানা প্রশ্ন আমাকে বন্ধুরা করেছেন। এই ব্লগপোস্টে সেগুলোর উত্তর আমি খানিকটা দেওয়ার চেষ্টা করবো।

প্রতিবেদনে কী কী প্রকাশ করা হয়েছে?

এই ব্লগপোস্ট পুরোপুরি বুঝতে আমি দীর্ঘপাঠটি পুরো একবার পড়ে নিতে বলবো, যদি না পড়ে থাকেন। আমাদের প্রতিবেদনে মূলত যেসব অজানা তথ্য বের করতে পেরেছি, সেগুলো হলো:

  • সাকিব আল হাসান আগারওয়ালের সঙ্গে দেখা করতে নিজের দুবাইয়ের হোটেল ঠিকানা দিয়েছিলেন;
  • আগারওয়ালকে সাকিব ও অন্যান্য খেলোয়াড়দের নম্বর দিয়েছিলেন বাংলাদেশের সাবেক বোলিং কোচ হিথ স্ট্রিক;
  • হিথ স্ট্রিক নিজেও আইসিসি’র তদন্তাধীন;
  • দীপক আগারওয়াল একেবারে চুনোপুঁটি কেউ নন, তিনি একটি নামিদামি ক্রিকেট লীগে একটি দলের মালিক ছিলেন;
  • দীপক আগারওয়াল দাবি করেছেন, তিনি কোনো অপরাধী নন, বরং তিনিই তদন্তে সহযোগীতা করেছেন, ইত্যাদি।

কেন এই অনুসন্ধান?

২৯ অক্টোবর আইসিসি সাকিব আল হাসানকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করে। সেদিনই আইসিসি’র ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়। সেখানেই প্রকাশ করা হয়, সন্দেহভাজন যেই জুয়াড়ির সঙ্গে কথা বলে সাকিবের ওপর নিষেধাজ্ঞার খড়গ নেমে আসে, সেই ব্যক্তিটির নাম দীপক আগারওয়াল। স্বাভাবিকভাবেই, দীপক আগারওয়ালকে নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতে বেশ তোলপাড় হয়ে যায়। গুগলে ‘কে এই দীপক আগারওয়াল?’ – এই শিরোনামে অসংখ্য সংবাদ প্রতিবেদন আপনি দেখতে পাবেন (প্রথম আলো, ইত্তেফাক, বাংলাদেশ প্রতিদিন)। প্রায় সবই ঘুরেফিরে একই কথা। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম থেকে অনূদিত। ভাসা ভাসা সব তথ্য।

আমি খেয়াল করলাম যে, এগুলোর কোনোটিতেই দীপক আগারওয়ালের সঙ্গে কথা বলা হয়নি। উপরন্তু, তার যেই ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, গুগল রিভার্স ইমেজ সার্চ করে দেখলাম যে, সেটি মূলত আমেরিকা প্রবাসী এক ভারতীয় ই-কমার্স ব্যবসায়ীর ছবি। এই ব্যক্তিই যে আমরা যেই দীপক আগারওয়ালকে খুঁজছি তিনি, তেমন কোনো প্রমাণ বা বক্তব্য কোথাও নেই।

মার্কিন ব্যবসা বিষয়ক সাময়িকী ফোর্বস-এ ২ বছর আগে নোমোরেরাক.কম-এর মালিক দীপক আগারওয়ালের এই ছবি প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশি মিডিয়ায় সাকিব ইস্যুতে তার ছবি ব্যপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ক্রেডিট: ফোর্বস ওয়েবসাইট

ফলে আমি নিজেই হালকা খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম। স্রেফ কৌতুহলের বশে। অর্থাৎ পুরো বিষয়টিই ঘটে যায় ঘটনাচক্রে। যেমনটা আমি প্রতিবেদনে লিখেছি:

আগারওয়ালের সঙ্গে যখন প্রথম যোগাযোগ করি, তখন কয়েকশ’ শব্দের সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার নেওয়ার চিন্তা ছিল। অনেকটা শর্ট ফরম্যাট ক্রিকেট ম্যাচের মতো। কিন্তু তিনি একের পর এক এমন সব তথ্য দিতে লাগলেন যে, সেগুলো যাচাইবাছাই করতে করতে ক্রমেই আমি ঢুকে পড়ি ক্রিকেট-দুর্নীতির গভীর মোহনায়। বেলা যখন সাঙ্গ হলো, ততক্ষণে আমরা টেস্ট ম্যাচ খেলে ফেলেছি।

শুরুটা টুইটার থেকে

টুইটারে আবিষ্কার করলাম Deepak_Aannya নামে একটি হ্যান্ডেল (নাম Deepak Aggarwal) থেকে সাকিবের বিষয়ে কথা বলা হচ্ছে। তার টাইমলাইনে ক্রিকেট সম্পর্কিত অনেক আলোচনা। ক্রিকপ্লেক্স নামে একটি ওয়েবসাইটের পোস্ট সেখানে বারবার শেয়ার করা হয়েছে। সেই ওয়েবসাইটেই দীপক আগারওয়াল ও সাকিবের নিষিদ্ধ হওয়া নিয়ে দু’টো নিবন্ধ (প্রথম, দ্বিতীয়) দেখতে পেলাম। সেখানে দীপক আগারওয়ালের স্বপক্ষে কিছু যুক্তি দেওয়া হলো। যেমন, তিনি নাকি আসলে জুয়াড়ি নন। কিছু খারাপ লোকের ব্ল্যাকমেইলিং-এর শিকার হয়ে সাকিবকে দুর্নীতির প্রস্তাব দিতে বাধ্য হয়েছেন। ইত্যাদি, ইত্যাদি।

পুরো বিষয়টি তখন আমার কাছে বেশ ‘ইন্ট্রিগিং’ মনে হলো। এছাড়া ফেসবুকে যখন তার বিষয়ে প্রাথমিক কিছু পোস্ট লিখলাম, তখন মিরাজ আহমেদ চৌধুরী (গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের বাংলা বিভাগের সম্পাদক) আমাকে বললেন আরেকটু ঘাঁটাঘাঁটি করতে। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম আরও একটু অনুসন্ধান করার।

এরপর ক্রিকপ্লেক্স

ক্রিকপ্লেক্স মূলত একটি ক্রিকেট বিষয়ক ওয়েবসাইট। ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে ধারাভাষ্য, সংবাদ, নিবন্ধ, ইত্যাদি সেখানে প্রকাশিত হয়। যেহেতু আগারওয়াল টুইটারে লিখেছিলেন যে, এটি তার ওয়েবসাইট (এছাড়া ওয়েবসাইটটিতে তার স্বপক্ষে একেবারে বিবৃতির মতো করে কিছু নিবন্ধ ছাপা হয়েছিল), সেহেতু আমি ক্রিকপ্লেক্সকে ধরেই সামনে আগানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।

ক্রিকপ্লেক্স-এর ওয়েবসাইটেই বলা আছে যে, তারা একটি ক্রিকেট একাডেমি পরিচালনা করে। সেই একাডেমির ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখলাম যে, সেখানে তাদের মালিক হিসেবে দীপক আগারওয়ালের নাম উল্লেখ করা। এমনকি তার পোর্ট্রেট ছবিও সেখানে দেওয়া আছে। এখন অবশ্য সেসব মুছে ফেলা হয়েছে। তাদের প্যারেন্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নাম দেওয়া আছে ‘Aannya Software’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের। এবার গেলাম তাদের ওয়েবসাইটে। পাঠক, মনে করে দেখুন, এই Aannya কিন্তু দীপক আগারওয়ালের টুইটার হ্যান্ডেলেও (Deepak_Aannya) ছিল। আমি আরও ঘাঁটাঘাঁটি করলাম, কিন্তু আপাতত এই ওয়েবসাইট থেকে খুব বেশি কোনো ক্লু উদ্ধার করতে পারিনি। শুধু জানা গেলো, এই প্রতিষ্ঠানের কাগুজে নাম হলো Aannya Softwares Pvt. Ltd।

এরপর গেলাম ভারতের কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে। সেখানে ভারতে নিবন্ধিত কোম্পানিগুলোর ডাটাবেজ আছে। এই ডাটাবেজে সার্চ দিলাম। দেখা গেলো, এই কোম্পানির মালিক হলেন দীপক আগারওয়াল ও মীনাক্ষী গার্গ নামে দুই ব্যক্তি। শুরুতে ধারণা করেছি ও পরে নিশ্চিত হয়েছি যে, মীনাক্ষী হলেন দীপক আগারওয়ালের স্ত্রী। দীপক আগারওয়ালের আরও দু’টি কোম্পানির সন্ধান পাওয়া গেলো কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রণালয়ের ডাটাবেজে। এর মধ্যে একটি হলো: CRICPLEX SPORTS MANAGEMENT PRIVATE LIMITED।

দীপক আগারওয়ালের নামে নিবন্ধিত কোম্পানিসমূহ | সূত্র: কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রণালয়, ভারত

এর ফলে ক্রিকপ্লেক্স ও Aannya-এর সঙ্গে দীপক আগারওয়ালের সংশ্লিষ্টতা মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেলো।

ডোমেইন WhoIs রেকর্ড

ডোমেইন WhoIs রেকর্ডে একটি ওয়েবসাইট কার নাম, ইমেইল বা ফোন নম্বর দিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে, সেটি উল্লেখ থাকে। তবে সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়েই এই তথ্য জনসাধারণ থেকে গোপন রাখা যায়। WhoIs রেকর্ড থেকে দীপক আগারওয়ালের ৩টি ওয়েবসাইটের তথ্য খোঁজার চেষ্টা করলাম। আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে, এগুলোর তথ্য গোপন থাকবে। কিন্তু আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ৩টি ওয়েবসাইটের তথ্যই দেওয়া আছে। ৩টি ওয়েবসাইটের বিপরীতে যতগুলো ফোন নম্বর WhoIs এ পেলাম, এবং ৩টি ওয়েবসাইটের যোগাযোগ পাতায় যতগুলো ফোন নম্বর পেলাম, সব টুকে রাখলাম। প্রথমে চিন্তা ছিল যে, প্রত্যেকটি নম্বরেই হোয়্যাটসঅ্যাপ থেকে নক করবো। কিন্তু সেটা করার প্রয়োজন পড়লো না। আগারওয়াল তার হোয়্যাটসঅ্যাপে নিজের ছবি দিয়ে রেখেছেন। যেহেতু আমি আগেই ক্রিকপ্লেক্স একাডেমির ওয়েবসাইটে তার ছবি দেখেছিলাম, সুতরাং নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে, আমি দীপক আগারওয়ালকে পেয়ে গেছি।

হোয়্যাটসঅ্যাপ/টুইটার আলাপ

এরপর আমি নিজের পরিচয় দিয়ে তাকে নক করলাম। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনি জবাব দিলেন। বললেন যে, তিনিই দীপক আগারওয়াল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই স্বীকার করলেন যে, হ্যাঁ, সাকিবকে তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। শুধু বললেন, ‘কেবল একটি তথ্যই সত্য নয়। আমি কোনো জুয়াড়ি নই।’

কিন্তু আমি শুধু তার স্বীকারোক্তিতেই সন্তুষ্ট হলাম না। প্রশ্ন করলাম সাকিবের সঙ্গে যে তার সত্যিই কথা হয়েছে, তার প্রমাণ কী। অনেক গাঁইগুইয়ের পর তিনি প্রথমে আমার পরিচয় নিশ্চিত হতে চাইলেন। জিজ্ঞেস করলেন, আমি কীভাবে তার নম্বর পেয়েছি। আমি পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বললাম। তাকে দেখে সন্তুষ্ট মনে হলো। এরপরও আমার পরিচয় নিশ্চিতের জন্য আমার টুইটার হ্যান্ডেল তাকে দিলাম। এরপর সেখানেই কিছুক্ষণ আলাপ করি আমরা। তিনি আমাকে সাকিবের সঙ্গে হওয়া আলাপনের একটি স্ক্রিনশট দেন, যেখানে সাকিব দুবাইয়ে নিজের হোটেল ঠিকানা দিয়েছিলেন তাকে। এরপর আইসিসি’র দুর্নীতি বিরোধী প্রধান অ্যালেক্স মার্শালের সঙ্গে কিছুক্ষণ আগে হওয়া আলাপের একটি স্ক্রিনশটও তিনি দেন।

বাকি কাহিনী আমি দীর্ঘপাঠে লিখেছি। তবে আরও কিছু বিষয় এখানে ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

টি-১০ দলের মালিকানা

আগারওয়ালকে আমি একবার প্রশ্ন করলাম যে, তুমি যে দাবি করছো, তুমি নিজেই আইসিসি’র কাছে গেছো, সেটার প্রয়োজন পড়লো কেন? তুমি তো চাইলে চুপ থাকতে পারতে। জবাবে তিনি আমাকে জানান যে, তিনি আবুধাবির টি১০ লীগে একটি দলের মালিক ছিলেন! সুতরাং, জুয়াড়ির কলঙ্ক নিয়ে তার পক্ষে কোনো দলের মালিক হওয়া সম্ভব নয়। আমি তখব ভীষণ বিস্মিত হলাম। প্রথমত, টি১০ লীগ একটা মেজর ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। বিশ্বের অনেক নামিদামি খেলোয়াড় সেখানে খেলেন। বলিউডি নায়ক-নায়িকারা তাদের ব্রান্ড অ্যাম্বাসেডর। সেই টুর্নামেন্টের একটি দলের মালিক হওয়া তো যেন তেন কথা নয়। তার মানে, দীপক আগারওয়াল কোনো ফড়িয়া নন।

দীপক আগারওয়াল (বামে) ও গৌরব গ্রোভার (মধ্য)

তার এই দাবি যাচাই করতে গিয়ে আমি সত্যতা পাই। ডেকান গ্ল্যাডিয়েটর্স বা সিন্ধি দলের সঙ্গে যে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল, সেটার স্বপক্ষে দীপক কোনো নথিপত্র দিতে রাজি হননি। তবে হিন্দুস্তান টাইমসে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছিলো। সেখানে দলের বর্তমান মালিক গৌরব গ্রোভার, আর লীগের মালিক সাজি উল মুলক অস্বীকার করে বলেন যে, দীপকের কোনো সংশ্লিষ্টতাই ছিল না। অথচ, আগারওয়াল বলছেন, গৌরব তার বন্ধু। শুধু সিন্ধি নয়, দলটির উত্তরসূরি (ও এই মৌসুমের রানারআপ) ডেকান গ্ল্যাডিয়েটর্সের সঙ্গেও তার সংশ্লিষ্টতা আছে। এমনকি ডেকান গ্ল্যাডিয়েটর্সের নাম রাখা হয়েছে দীপক ও গৌরবের নামের আদ্যক্ষরের সঙ্গে মিল রেখে। এসব সাংঘর্ষিক বক্তব্যের কারণে আমি রহস্যের গন্ধ পাই। আরও অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিই।

ডেকান গ্ল্যাডিয়েটর্সের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের WhoIs রেকর্ড দেখতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম যে, এই ওয়েবসাইটটি কেনা হয়েছে আগারওয়ালের মালিকানাধীন CricPlex-এর একটি ইমেইল ব্যবহার করে। অর্থাৎ, গৌরব যেমন বলছেন, কোনো সংশ্লিষ্টতাই ছিল না আগারওয়ালের, বিষয়টি তেমন নয়।

ডেকান গ্ল্যাডিয়েটর্সের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট নিবন্ধন করা হয়েছে আগারওয়ালের ক্রিকপ্লেক্স ইমেইল দিয়ে। সূত্র: গোড্যাডি হু ইজ।

এছাড়া দীপক আমাকে একটি ছবি দিয়েছিলেন। সেখানে দেখা যাচ্ছে, সিন্ধি দলের একটি খেলায় পুরষ্কার বিতরণী মঞ্চে তিনি ও গ্রোভার পুরষ্কার দিচ্ছেন খেলোয়াড়দের। আমি ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখলাম, ওই ম্যাচ ছিল মূলত দ্বিতীয় মৌসুমে, সিন্ধি ও পাখতুন দলের মধ্যে। ওই ম্যাচের ছবি খুঁজে পেলাম লীগের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে।

আবুধাবির টি-১০ লীগের দ্বিতীয় মৌসুমে সিন্ধি বনাব পাখতুনের খেলায় পুরষ্কার বিতরণী মঞ্চে গৌরব গ্রোভার (কালো শার্ট) ও আগারওয়াল (সাদা শার্ট) | ছবি: টি১০ লীগ, আবুধাবি ওয়েবসাইট

পুরো ম্যাচটিই পেলাম ইউটিউব চ্যানেলে। সেখানে আমি নিশ্চিত হলাম যে, তার দাবি অনেকখানিই সত্য। আরও পরে আমি দীপক আর গ্রোভারের ঘনিষ্ট কিছু প্রমাণ পাই, যা থেকে বুঝতে পারি যে, তারা আসলেই বন্ধু। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে হোক, বা ইমেজ সংকটের কারণে হোক, গ্রোভার অন্তত প্রকাশ্যে এখন দীপককে মানছেন না। এরপর তো লীগের তৎকালীন এক শীর্ষ কর্তার সঙ্গে আমি যোগাযোগ করি। সেই ব্যক্তিই আমাকে জানান মূল কাহিনী, যা আমি দীর্ঘপাঠে লিখেছি।

সিন্ধি বনাম পাখতুন ম্যাচ শেষে পুরষ্কার দিচ্ছেন দীপক আগারওয়াল ও গৌরব গ্রোভার
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও টি১০ লীগের চেয়ারম্যান সাজি উল মুল্ক | ক্রেডিট: মুল্ক হোল্ডিংস

লীগের মালিক সাজি উল মুলক খুবই ধুরন্ধর ব্যক্তি। আরব আমিরাত প্রবাসী এই ভারতীয় অত্যন্ত ধনী। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সহ বহু ক্ষমতাধর লোকদের সঙ্গে তার উঠাবসা। তিনি আমার প্রশ্নের ব্যাপারে তার ব্যাখ্যা আমাকে দিয়েছিলেন। আমি তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছি। তবে মজার বিষয় হলো, তিনি আমাকে বাংলাদেশে তার লীগের মিডিয়া রিলেশন্স দেখভালের প্রস্তাব দেন। কিন্তু কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের প্রসঙ্গ তুলে আমি ওই প্রস্তাব এড়িয়ে যাই।

গ্রোভার এখানে বেশ ইন্টারেস্টিং একটা কারেক্টার। যেই স্কিমে আগারওয়াল জড়িত ছিলেন, সেই ব্যাপারে গ্রোভারের কিছু না কিছু জানার কথা। তার ওপর লীগের ওই সাবেক শীর্ষ কর্তা আমাকে জানান যে, গ্রোভার ও আগারওয়াল উভয়কেই তার ‘সন্দেহজনক’ মনে হয়েছিল। আমি সেজন্যই অনেক চেষ্টা করেছি তার ব্যাপারে তথ্য জানতে। কিন্তু গ্রোভারের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে কোনো তথ্যই পাইনি। পাবলিক ডোমেইনে তার সমস্ত তথ্যই এসেছে ডেকান গ্ল্যাডিয়েটর্সের মালিক হওয়ার পর। কিন্তু তার মূল ব্যবসা কী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম কী, কিছুই জানা যায়নি! গ্রোভারের সঙ্গে আমি নানাভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। তিনি আমার বার্তা পেয়েছিলেনও। কিন্তু জবাব দেননি।

আগারওয়ালের অতীত

আগারওয়ালের বাড়ি কোথায়, তা নিয়ে একেক সংবাদ মাধ্যমে একেকভাবে এসেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি হরিয়ানার বাসিন্দা। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, রাজস্থানের উদয়পুর। আগারওয়াল আমাকে বলেছেন, তার মূল বাড়ি দিল্লি। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ২০১১ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, উদয়পুরে এক তরুণ ক্রিকেটার আত্মহত্যা করেছিলেন আগারওয়ালের কারণে। আগারওয়াল তখন গ্রেপ্তারও হয়েছিল। তৎকালীন অ্যাডিশনাল এসপি তেজরাজ সিং তখন বলেছিলেন যে, আত্মহত্যাকারী ওই ক্রিকেটার দীপক ‘আগরাওয়াল’ নামে এক জুয়াড়িকে দায়ী করে গেছেন। এখন এই দীপক ‘আগরাওয়াল’ই যে আমাদের ‘দীপক আগারওয়াল’ সেটা বোঝা কঠিন। যাই হোক, ওই প্রতিবেদনের সূত্র ধরে অনেক সংবাদ মাধ্যমই এই প্রসঙ্গ তুলে ধরে। কিন্তু সবাই মোটামুটি ধরেই নেয় যে, দুই আগারওয়ালই একই আগারওয়াল। কিন্তু এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ নয়। তার ওপর আগারওয়াল আমার কাছে পুরো অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি ওই পুলিশ কর্মকর্তা তেজরাজ সিং ও একটি চ্যানেলের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ ঠুকে দেন। আগারওয়ালের এমন আত্মবিশ্বাসের ফলে আরও দোদুল্যমান অবস্থা সৃষ্টি হয়।

আমি এবার উদয়পুরে যোগাযোগ করতে শুরু করি। সেখানে স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক ভাষ্কর এর সম্পাদক আমাকে সহায়তা করেন। উদয়পুর টাইমস নামে স্থানীয় সংবাদ বিষয়ক ওয়েবসাইটের এক ঝানু প্রতিবেদক আমাকে সহায়তা করেন। আমার বন্ধু রয়টার্সের সাংবাদিক জেবা সিদ্দিকী তার এক বন্ধুকেও সংশ্লিষ্ট করে। তিনি উদয়পুর/জয়পুরে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কারেসপন্ডেন্ট।

কিন্তু ‘আগরাওয়াল’ সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া গেলেও, তিনিই যে আমাদের কাঙ্খিত আগারওয়াল, তা কোনোভাবেই নিশ্চিত হওয়া গেল না। উদয়পুরের পুলিশ সুপারও আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। কিন্তু অনেক পুরোনো মামলা হওয়ায়, মামলার নথি আদালতে চলে যায়। উদয়পুর টাইমসের ওই প্রতিবেদক আদালত থেকে ওই মামলার নথি উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। কিন্তু সফল হননি।

সবচেয়ে বড় উপকারে আসতে পারতেন তেজরাজ সিং, যিনি ওই সময় উদয়পুরের অ্যাডিশনাল এসপি ছিলেন। তিনি এখন রাজস্থান রাজ্য দুর্যোগ প্রতিরোধ বাহিনীর কমান্ড্যান্ট। হোয়্যাটসঅ্যাপে আমার মেসেজ ‘সিন’ করে বেচারা বোধ হয় হোয়্যাটসঅ্যাপই আনইন্সটল করে দিয়েছিলেন। ভদ্রলোককে আমি অসংখ্যবার ফোন দিয়েছি। কিন্তু ধরেননি বা ধরলেও কথা শুনে কেটে দিয়েছেন। হয়তো বিষয়টি অনেক সংবেদনশীল। কিংবা আগারওয়ালের মানহানি মামলা বা মিডিয়া কাভারেজ দেখে তিনি ঘাবড়ে গেছেন। অগত্যা, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কারেসপন্ডেন্ট তার সঙ্গে কথা বলে সামান্য একটু মন্তব্য নিতে সক্ষম হই। কিন্তু তাকে যদি আগারওয়ালের ছবি দেখানো সম্ভব হতো, তাহলে হয়তো ‘হ্যাঁ’/’না’ জানা যেতো। এটাই পুরো প্রতিবেদনে আমাদের অপ্রাপ্তি।

এছাড়া সাকিব ও আইসিসি’র মন্তব্য বা ব্যাখ্যা না পাওয়াটা হতাশাজনক ছিলো। কিন্তু সেখানে তো আর আমাদের করার কিছু ছিল না।

আগারওয়াল কি তাহলে দুধে ধোয়া তুলশি পাতা?

যদিও আগারওয়ালের অনেক দাবির কিছুটা সত্যতা আমি পেয়েছি, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তিনি একেবারে নিষ্পাপ। আমাকে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের দুর্নীতি-বিরোধী বিভাগের প্রধান অজিত সিং বলেছেন যে, তাদের কাছে দীপক আগারওয়ালের ব্যাপারে কোনো তথ্য ছিল না। থাকলে তারা ব্যবস্থা নিতেন।

বাই নেচার, ১০ ওভারের ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ঝামেলাপূর্ণ। এসব টুর্নামেন্টে স্পট ফিক্সিং করার সুযোগ থাকে অবারিত। আল জাজিরার ‘ক্রিকেট’স ম্যাচ ফিক্সার্স’ ডকুমেন্টারি যারা দেখেছেন, তারা জানবেন যে, স্পট ফিক্সিং করার জন্যই সংক্ষিপ্ত ওভারের ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন হয়েছে অনেক। আমি বলছি না যে, টি১০ লিগ, আবুধাবিও সেরকম। কিন্তু এই টুর্নামেন্ট থেকে অনেক খেলোয়াড় ও কর্মকর্তা নিষিদ্ধ হয়েছে। এছাড়া আগারওয়াল বা গ্রোভারের মতো রহস্যজনক ব্যক্তিবিশেষ এ লীগের দলের মালিক হতে পারে, এ থেকেও বোঝা যায় এখানে স্বচ্ছতার অভাব আছে ব্যপক।

আল জাজিরা’র তথ্যচিত্র: ক্রিকেট’স ম্যাচ ফিক্সার্স

আমাকে টি১০ লীগের সাবেক ওই শীর্ষ কর্তা বলেছেন, প্রায় ১.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১১ কোটি টাকা দিয়ে তারা কেবল দলের সত্ত্ব কিনেছিলেন। কিন্তু সামান্য একটা ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ফার্ম বা ক্রিকেট একাডেমি চালিয়ে তো এই বয়সে এত টাকা উপার্জন করা সম্ভব নয়। আমি টাকাপয়সার কথা তুলতেই আগারওয়াল সন্দিগ্ধ হয়ে উঠেন। আমাকে বললেন, ‘এসবের সঙ্গে টাকাপয়সার সম্পর্ক কী? ভাই, আমরা মনে হয় অনেক গভীরে চলে যাচ্ছি। সাধারণ তথ্য নেওয়াই মনে হয় ভালো হবে।’ তবে পরে তিনি আমার কাছে দাবি করেন, তিনি পারিবারিকভাবেই অনেক ধনী। একটি দল নয় কেবল, পুরো লীগ কিনে নেওয়ার সামর্থ্য আছে তার!

সবচেয়ে বড় কথা, আমি আগারওয়ালের সাবেক এক কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছিলাম। বিভিন্ন কারণে আমি বুঝতে পারি যে, তার কাছে অনেক তথ্য আছে। সেই কর্মী কিছুতেই আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়নি, তবে এক পর্যায়ে রাজি হয়। কিন্তু সব তথ্যের বিনিময়ে সে আমার কাছে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করে। সঙ্গত কারণেই আমি রাজি হইনি। কিন্তু তার কাছে আমি আগারওয়াল ও অ্যালেক্স মার্শালের (আইসিসি’র দুর্নীতি-বিরোধী বিভাগের প্রধান) কথোপকথনের ট্রান্সক্রিপ্ট দেখেছিলাম। তার ভাষ্য, আগারওয়াল একটা ‘খারাপ লোক’। এছাড়া এই সাবেক কর্মী নিজের সেফটি ও সিকিউরিটি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন ছিল। তার কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছে যে, পুরো বিষয়টিই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপনীয়তায় মোড়া। এই কর্মী আগারওয়ালের বিষয়ে যেভাবে ভয়ার্ত সুরে কথা বলতেন, আগারওয়ালও কথিত ব্ল্যাকমেইলারদের ব্যাপারে তেমন ভয়ার্ত সুরে কথা বলতেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণেই তার বক্তব্য আমলে নিতে পারিনি। প্রথমত, ওই কর্মী অফ দ্য রেকর্ডেও আমাকে তার বক্তব্য প্রকাশ করার অনুমতি দেয়নি। দ্বিতীয়ত, ওই কর্মী ‘সংক্ষুদ্ধ’ সাবেক কর্মীও হতে পারেন। ফলে তার বক্তব্য বিশ্বাস করা যায় না পুরোপুরি।

পরিশেষে

যেমনটা আমি প্রতিবেদনে লিখেছি, আগারওয়াল নিজেকে রাজস্বাক্ষী বা হুইসেলব্লোয়ার দাবি করেন। কিন্তু আইসিসি বা দুর্নীতি বিরোধী ইউনিট (এসিইউ) এই দাবি নিশ্চিত করেনি, কারণ তদন্ত এখনও চলছে। তবে আইসিসি’র কাছে তথ্য জানতে চেয়ে ইমেইল করার দিন কয়েকের মধ্যেই আমি জানতে পারি যে, আগারওয়ালকেও কয়েক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছে আইসিসি। কিন্তু আগারওয়াল তো খেলোয়াড় নন। ফলে এই নিষেধাজ্ঞার ধরণ বা প্রকৃতি কী ধরণের? এ ব্যাপারে আইসিসি’র কাছে নিশ্চিত হতে ইমেইল দিলেও, কোনো উত্তর পাইনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − four =