Site Overlay

কভিড-১৯ চিকিৎসায় ব্যবহৃত জাপানি ওষুধ অ্যাভিগান দেশে উৎপাদন নিয়ে কিছু কথা

আপনারা অনেকেই একটি সংবাদ দেখেছেন যে, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস নামে দু’টি দেশীয় ওষুধ কোম্পানি করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত জাপানি ওষুধ অ্যাভিগান বা ফাভিপিরা দেশীয়ভাবে উৎপাদন করছে। এই নিয়ে আমি অনেক পোস্ট দেখেছি ফেসবুকে। অনেকে বেক্সিমকো ও বিকনের এই সিদ্ধান্তকে সন্দিগ্ধ চোখে দেখছেন। অনেকে আবার আবার ভাবছেন, এটিই এই রোগের মহৌষধ। অনেক জায়গায় স্রেফ গাঁজাখুরি কথাবার্তাও দেখেছি।

জাপানি ওষুধ অ্যাভিগান আসলে কী?

জাপানের বিখ্যাত ফুজিফিল্মের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই। জ্বি, ক্যামেরা কোম্পানির কথাই বলছি। বয়স্করা বেশি মনে রাখতে পারবেন। ডিএসএলআর-এর জমানা আসার আগে ফুজিফিল্মের ক্যামেরাই ছিল সেরা। এখনও আমাদের দেশে অনেক ফটো স্টুডিওতে ফুজিফিল্মের লোগো দেখা যায়।

তো, এই ফুজিফিল্মের একটি ফার্মাসিউটিক্যাল উপশাখা আছে, যারা ২০১৪ সালে ফাভিপিরাভির নামে একটি অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ তৈরি করেছিল। ফাভিপিরাভির জেনেরিক নাম। ফুজিফিল্ম এর নাম দিয়েছে অ্যাভিগান। এটি ফাভিপিরা হিসেবেও পরিচিত। সাধারণত, ভাইরাস-জনিত (ব্যাকটেরিয়া-জনিত নয়) ফ্লু রোগের চিকিৎসায় এই ওষুধ ব্যবহার করা হয়। ফ্লু রোগ কী? ফ্লু হলো শ্বাসতন্ত্রের ছোঁয়াচে রোগ, যা সাধারণত নাক, গলা ও ফুসফুসে আক্রমণ করে। পরিস্থিতি খারাপ হলে রোগী মারাও যেতে পারে। বুঝতেই পারছেন এই মিল থাকার কারণে ফ্লুর সঙ্গে করোনাভাইরাস জনিত কভিড-১৯ রোগের তুলনা করা হয় প্রায়ই। ফ্লু রোগ হয় মূলত ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের আক্রমণে। ইনফ্লুয়েঞ্জা কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ভাইরাসের নাম নয়। নানা ধরণের ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস আছে।

আফ্রিকার ইবোলা মহামারির কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? ওই রোগের চিকিৎসায় জাপান সরকার জরুরী ভিত্তিতে এই ওষুধ পাঠিয়েছিল উপদ্রুত এলাকায়। ইবোলায় এই ওষুধের কার্যকারিতা প্রমাণিত নয়, তবে আক্রান্তদের মধ্যে এই ওষুধ প্রয়োগে উপকারিতা পাওয়া গেছে। লাইবেরিয়ায় ডক্টর্স উইদাউট বর্ডার্সের এক ফরাসি নার্স ইবোলা আক্রান্ত হলে, এই ওষুধ সেবনে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন

অ্যাভিগান
অ্যাভিগান | ক্রেডিট: এএফপি/ওয়্যার্ড

অ্যাভিগান নিয়ে এখন কেন এত আলোচনা?

আপনারা সবাই জানেন যে, করোনাভাইরাসের কোনো ওষুধ এখনও নেই। তাহলে প্রশ্ন হলো, যারা এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, তাদেরকে কী ওষুধ দেওয়া হয়? তাদেরকে অ্যান্টি-ভাইরাল বা ফ্লু রোগের ওষুধই দেওয়া হয়। এমনই একটি ওষুধ হলো অ্যাভিগান। আবার হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন নামে ম্যালেরিয়ার এক ওষুধ নিয়ে আলোচনা চলছে। যেমন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই ওষুধকে রীতিমত প্রমোট করেছেন। অনেক জায়গায় বিভিন্ন ওষুধের মিশেল ব্যবহার করছেন ডাক্তাররা।

মার্চের মাঝামাঝি মূলত অ্যাভিগান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ফেব্রুয়ারিতে চীনে এই ওষুধের ক্লিনিক্যাল (অথবা প্রি-ট্রায়াল) ট্রায়াল শুরু হয়। তখনও এ নিয়ে তেমন আলোচনা দেখা যায়নি। ১৮ই মার্চ বৃটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকা এক প্রতিবেদনে জানায়, এই অ্যাভিগানের প্রশংসা করেছেন খোদ চীনা চিকিৎসকরা। তাদের ভাষায়, এই ওষুধ “স্পষ্টতই কার্যকরি”। তখন কিন্তু চীনে করোনার প্রকোপ কমে আসছিল। ফলে চীনা ডাক্তারদের কথাকে সবাই গুরুত্ব দিচ্ছিল।

আরেকটি কথা না বললেই নয় যে, চীন ও জাপানের মধ্যে কিন্তু ঐতিহাসিক বৈরিতা। এখনও দুই দেশের মধ্যে সাপে-নেউলে সম্পর্ক। সুতরাং, চীনের মতো কঠোরভাবে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত একটি দেশের ডাক্তাররা যখন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আরেক দেশের ওষুধের প্রশংসা করেন, সেটি মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনা কম। শুধু ডাক্তার নয়, গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খোদ চীনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ করে প্রকাশ্যেই বলেছেন, করোনা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে অ্যাভিগান ব্যবহার করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাওয়া গেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ডেভেলপমেন্টের প্রধান ঝ্যাং জিনমিন নামে ওই কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, এই ওষুধের ততটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই ও এটি ‘অত্যন্ত নিরাপদ’। আনুষ্ঠানিকভাবে করোনার চিকিৎসায় এই ওষুধ ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন তারা।

ফুজিফিল্ম থেকে লাইসেন্স গ্রহণ করে চীনের একটি প্রতিষ্ঠান এই ওষুধ উৎপাদনে সরকারের অনুমতিও নিয়ে রেখেছে

তবে এখানে বলে রাখা ভালো, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো অন্য ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা শেষ করতে পারেনি। তাই তুলনায় আসা যাচ্ছে না। রামদেসিভির নামে আরেকটি ওষুধ নিয়েও আশা ছিল। কিন্তু ওই ওষুধের নেতিবাচক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।

কী ধরণের সাফল্য?

উহান ও শেনজেনের ৩৪০ জন করোনা আক্রান্ত রোগীকে এই ওষুধ দেওয়া হয়। দেখা গেছে ৯১ শতাংশ রোগীর ফুসফুসে উন্নতি হয়েছে। এই ওষুধ ছাড়া অন্যভাবে চিকিৎসা করা রোগীদের মধ্যে ৬২ শতাংশের ফুসফুসে উন্নতি দেখা গেছে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, সাধারণভাবে গড়ে (মিডিয়ান) একজন করোনা আক্রান্ত রোগীর সুস্থ হতে ১১ দিন লাগে। এই ওষুধ ব্যবহার করা হলে, লাগে ৪ দিন!

উহানের পৃথক একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, গড়ে রোগীদের সাধারণত ৪.২ দিন জ্বর থাকে। তবে এই ওষুধ ব্যবহার করলে গড়ে রোগীদের জ্বর থাকে ২.৫ দিন।

জাপানি ডাক্তাররাও করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসায় এই ওষুধ ব্যবহার করছেন। তবে তারা প্রশংসায় গলে যাননি। জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলছেন, ৭০-৮০ জন রোগীকে তারা এই ওষুধ দিয়েছেন। দেখা যাচ্ছে মৃদু ও মাঝারি লক্ষণের রোগীরা উপকার পান। কিন্তু যাদের শরীরে ইতিমধ্যেই ভাইরাস ছড়িয়ে গেছে ব্যাপকহারে, তাদের ক্ষেত্রে এই ওষুধ অত কার্যকরি নয়

তবে এই বক্তব্য সত্য হলেও অ্যাভিগানের গুরুত্ব কমে যায় না। প্রথমত, যাদের মধ্যে মৃদু ও মাঝারি আকারের সংক্রমণ রয়েছে, তারা এই ওষুধ সেবন করলে যদি ভাইরাস শরীরে ব্যপকভাবে ছড়াতে না পারে, তাহলেই তো ব্যপক উন্নতি। দ্বিতীয়ত, মৃদু ও মাঝারি লক্ষণধারী রোগীরা যদি এই ওষুধ সেবনে স্বাভাবিকের চেয়েও তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যান, তাহলে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ অনেকাংশেই লাঘব হয়ে যাবে। হাসপাতালগুলো গুরুতর আক্রান্ত রোগীদের ওপর মনোনিবেশ করতে পারবে বেশি।

এই ওষুধ এতই যদি কার্যকরি হবে, অন্য দেশগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে না কেন?

প্রথমত, আগেই বলেছি যে, করোনা চিকিৎসায় কোনো ওষুধই নির্দিষ্টভাবে অনুমোদিত নয়। ফলে ডাক্তাররা বিভিন্ন ওষুধই পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় খাদ্য ও ওষুধ সংস্থার (এফডিএ) অনুমোদন নিয়ে ম্যাচাচুসেটস অঙ্গরাজ্যে এই ওষুধের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা শুরু হয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বলেছেন, সরকার এই ওষুধের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা এগিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছে। কভিড-১৯ রোগের চিকিৎসায় অ্যাভিগান আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহারের স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

ফুজিফিল্ম থেকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এসব পরীক্ষা শেষেই একে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেওয়া যাবে। তার আগে কোনো ওষুধ রোগীদের ওপর প্রয়োগের এখতিয়ার সরকারের নেই। তবে জাপান থেকে ইতিমধ্যেই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, করোনা আক্রান্ত ২০টি দেশে এই ওষুধ সরবরাহ করা হবে। এছাড়া আরও ৩০টি দেশ যারা আগ্রহ প্রকাশ করেছে, তাদের দেওয়া হবে।

বাংলাদেশে বেক্সিমকো ও বিকন তাহলে কী করলো?

এই ওষুধ আনুষ্ঠানিকভাবে করোনার চিকিৎসায় ব্যবহারের স্বীকৃতি পাওয়া যাবে ধরে নিয়ে বেক্সিমকো ফার্মা ও বিকন ফার্মা নামে দুই দেশীয় প্রতিষ্ঠান এই ওষুধ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। তারা মূলত অ্যাভিগানের জেনেরিক সংস্করণ ফাভিপিরাভির উৎপাদন করবে। বেক্সিমকো বলছে, মাত্র ১ মাসের মধ্যেই তারা এই ওষুধ উৎপাদন করতে পেরেছে। ওষুধ প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে এই ওষুধ আরও উৎপাদন করে করোনা চিকিৎসায় নির্ধারিত হাসপাতালে বিনামূল্যে সরবরাহ করা হবে। বিকন ফার্মা ৪ হাজার ট্যাবলেট বিনামূল্যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য সরবরাহ করেছে। বেক্সিমকো বলছে, বাজারে এই ওষুধ দেওয়া হবে না, কারণ মানুষ অপ্রয়োজনে এই ওষুধ মজুত করার চেষ্টা করবে। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, বেক্সিমকোর অবস্থান যেকোনো দিক দিয়েই প্রশংসাযোগ্য। কায়েমী স্বার্থের লক্ষণ এখানে দৃশ্যমান হয়নি।

তবে বিকন বা বেক্সিমকোর জেনেরিক ওষুধ অ্যাভিগানের মতো সমান কার্যকারিতা দেবে কিনা, সেটি হলফ করে বলা যায় না। উভয় কোম্পানিই অবশ্য অন্যান্য দেশের মতো সরকারিভাবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করেই হাসপাতালে সরবরাহ করবে।

তাহলে উন্নত দেশগুলো এই ওষুধ বানাচ্ছে না কেন?

উন্নত দেশগুলো বানাতে পারছে না, কারণ তাদের দেশে ওষুধের ‘প্যাটেন্ট’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যত কিছুই হোক, প্যাটেন্ট লঙ্ঘণ করে এক কোম্পানির ওষুধ আরেক কোম্পানি বানাতে পারবে না। কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশ এলডিসি-ভুক্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন ও রপ্তানিও করতে পারে। মূলত, এ কারণেই আমাদের ফার্মা শিল্প এতটা বিকশিত হয়েছে। ঠিক একই কারণে আপনি কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই উইন্ডোজ বা ফটোশপের মতো পাইরেটেড সফটওয়্যার বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারছেন। তবে ২০২৪ সাল নাগাদ এলডিসি বা লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রি’র তালিকা থেকে উন্নীত হওয়ার পর আমরা হয়তো এই সুযোগ আর পাবো না। তখন হয়তো এই সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিধিবিধান মেনে চলতে হবে, যা এখন মধ্যম আয়ের ও উন্নত দেশগুলোকে মেনে চলতে হয়।

ডিসক্লেইমার: প্রথমত, আমি ডাক্তার বা স্বাস্থ্য পেশার সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নই। প্রকাশ্যে উপলভ্য সূত্র ব্যবহার করে এই লেখা লিখেছি। এই লেখার ওপর নির্ভর করে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। দ্বিতীয়ত, উপর্যুক্ত দু’টি দেশীয় কোম্পানির একটির সঙ্গে আমি পেশাগতভাবে সম্পৃক্ত। আমার বক্তব্য বিশ্বাস করার আগে এই তথ্য আপনাদের জানা প্রয়োজন মনে করছি। আমি চেষ্টা করেছি এই সম্পৃক্ততা যেন আমার বিশ্লেষণকে প্রভাবিত করতে না পারে। আমি আমার ফেসবুক ও ব্লগে আমার পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু নিয়ে লেখা থেকে বিরত থাকি। এই লেখার জন্য আমাকে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি ফরমায়েশ দেননি, আমি কারও সঙ্গে কথা বলেও লিখিনি। সম্পূর্ণ স্বতস্ফূর্তভাবে এই লেখার অবতারণা। বাকিটা বিচারের দায়ভার আপনার।

(সংশোধনী-১: আগের সংস্করণে লেখা হয়েছিল অন্য ওষুধের বিপরীতে এই ওষুধ ব্যবহার করে সাফল্য পাওয়া গেছে। আদতে তা নয়। সাধারণভাবে চিকিৎসার আওতায় থাকা রোগিদের তুলনায় এই ওষুধ সেবনকারী রোগীদের মধ্যে সাফল্য বেশি গেছে।)